কোলেস্টেরল আর ক্যান্সারের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে? আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে দুইটা ভিন্ন জিনিস।
ক্যান্সার কোষগুলোর এক ধরণের আগ্রাসী "ক্ষুধা" থাকে, যেনো তারা অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি বজায় রাখতে দ্রুত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে। টিউমার-দমনকারী জিন 'TP53'-এর মিউটেশন বহনকারী অনেক ক্যান্সার বিশেষভাবে কোলেস্টেরল উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে তারা এই লিপিডটিকে কোষের সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য একটি প্রধান জ্বালানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে।
এই যোগসূত্রটিই ধরে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি নতুন গবেষণায় দেখেন যে কোলেস্টেরল বিপাক (metabolism) নিয়ন্ত্রণকারী প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত করে ক্যান্সার কোষগুলোকে ক্ষুধার্ত রেখে টিউমারের বৃদ্ধিকে ধীর করা সম্ভব।
'সায়েন্স অ্যাডভান্সেস' (Science Advances) জার্নালে প্রকাশিত তাদের ফলাফলগুলো দেখিয়েছে যে ইঁদুরের শরীরে TP53 মিউটেশনযুক্ত ক্যান্সার বৃদ্ধির জন্য লিপিড এনজাইম পরিবারের একটি শাখা, যা 'ফসফেটিডিলিনোসিটল-৫-ফসফেট ৪-কাইনেসেস' (PI5P4Ks) নামে পরিচিত, তার উপস্থিতি দরকার। এই এনজাইমগুলো কোষের ভেতরের লাইসোজোম থেকে কোলেস্টেরল স্থানান্তরের সাথে জড়িত, যা পরবর্তীতে কোষ বৃদ্ধির একটি প্রধান পথকে সক্রিয় করে তোলে। গবেষণার সহ-লেখক ব্রুক এমারলিং বলেন, "আপনি যখন এই কাইনেসগুলোকে দমন করেন (delete), তখন প্রাণীরা ১০০ ভাগ সুরক্ষিত থাকে এবং তাদের শরীরে কখনোই টিউমার তৈরি হয় না—আর কোলেস্টেরলই এই ধাঁধার অন্যতম একটি হারিয়ে যাওয়া সূত্র হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।" এই ফলাফলগুলো স্তন ক্যান্সারের মতো যেসব টিউমারে সাধারণত TP53 মিউটেশন থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে PI5P4Ks ব্লক করা একটি লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা কৌশল (targeted treatment strategy) হিসেবে কাজ করবে।
টিউমার বৃদ্ধিতে লিপিড এনজাইমের ভূমিকা অধ্যয়নের জন্য গবেষকরা এমন 'p53 নকআউট' (p53 knockout) ইঁদুর ব্যবহার করেছিলেন যাদের শরীরে হয় এই PI5P4Ks কার্যক্ষম ছিল অথবা সম্পূর্ণভাবে মুছে দেওয়া হয়েছিল। কার্যক্ষম কাইনেসযুক্ত ইঁদুরগুলোর স্তন টিস্যুতে টিউমার তৈরি হয়েছিল, কিন্তু যাদের শরীরে এগুলো ছিল না তারা টিউমার গঠন (tumorigenesis) থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা প্রদর্শন করেছিল। যখন দলটি এই কাইনেসগুলোর মিউটেশন বিশ্লেষণ করে, তখন তারা দেখতে পায় যে এই ধরণের মিউটেশন বিরল হলেও PI5P4Ks প্রায়শই অতি-প্রকাশিত (overexpressed) অবস্থায় থাকে। এমারলিং এবং তাঁর দল স্তন ক্যান্সারের প্রেক্ষাপটে এই এনজাইমগুলোর জিন এক্সপ্রেশন এবং সম্পর্কিত পথগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেন। তারা অটোফ্যাজি (autophagy—পুষ্টির অভাবের কারণে সক্রিয় হওয়া একটি প্রক্রিয়া)-র পাশাপাশি কোলেস্টেরল পরিবহন পথ এবং কোষ বৃদ্ধির একটি অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক 'mTORC1' (mechanistic target of rapamycin complex 1) সক্রিয়করণের সাথে এর সম্পর্ক খুঁজে পান।
কোলেস্টেরলের ভারসাম্য বা হোমিওস্ট্যাসিসে (homeostasis) PI5P4Ks-এর ভূমিকা আরও বিশদভাবে তদন্ত করতে গবেষকরা কালচার করা স্তন ক্যান্সার কোষ ব্যবহার করে পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালান। তারা স্টেইনিং বা রঞ্জন পদ্ধতির মাধ্যমে আপেক্ষিক কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিমাপ করেন এবং কোষের ভেতরে কোলেস্টেরলের চলাচল ট্র্যাক বা পর্যবেক্ষণ করেন।
TP53 মিউটেশন এবং কার্যক্ষম PI5P4Ks যুক্ত ক্যান্সার কোষগুলোতে গবেষকরা কোষের ঝিল্লি বা মেমব্রেনের কাছাকাছি কোলেস্টেরল-বোঝাই লাইসোজোম লক্ষ্য করেছিলেন। কোলেস্টেরল পরিবহনের জন্য এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়েছিল, কারণ কোষের ঝিল্লির কাছাকাছি থাকা লাইসোজোমগুলো mTORC1 সিগন্যালিং সক্রিয়করণের সাথে জড়িত ছিল। এর বিপরীতে, যেসব কোষে PI5P4Ks ছিল না, সেগুলোর লাইসোজোম নিউক্লিয়াসের কাছাকাছি অবস্থান করছিল।
যখন লাইসোজোমের অবস্থান কোষের নিউক্লিয়াসের দিকে ঝুঁকে থাকে, তখন mTORC1-এর সক্রিয়তা দমিত বা বাধাগ্রস্ত হয়। এই কাইনেসগুলোর অনুপস্থিতি ক্যান্সার কোষগুলোর মধ্যে অনাহারের মতো (starvation-like) অবস্থার সৃষ্টি করে।
এই ফলাফলগুলো লাইসোজোমাল কোলেস্টেরলের ভারসাম্য এবং mTORC1 সিগন্যালিং বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি আপস্ট্রিম প্রক্রিয়া (upstream mechanism) হিসেবে PI5P4Ks-এর ভূমিকা প্রদর্শন করে। এই আবিষ্কারগুলোর ওপর ভিত্তি করে এমারলিং জোর দিয়ে বলেন যে, "আমরা যদি কোলেস্টেরলের উপস্থিতি টের পাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে ব্লক করে আক্রমণাত্মক ক্যান্সারগুলোতে mTOR-এর কার্যকারিতাকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারি, তবে সেটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় চিকিৎসা কৌশল হবে।"




No comments:
Post a Comment